মার্চেন্টের গল্প

একডালা গ্রামের ডিজিটাল ব্যবসায়ী মজিদ

By জুন 22, 2022 No Comments

সারসংক্ষেপ

সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত একডালা গ্রামের মজিদ ভাই পড়াশুনা শেষ করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যদের মতো প্রযুক্তি তাঁকে প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। ফলে, সনাতন হিসাব রাখবার পদ্ধতি তিনি ছেড়ে এলেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব রাখার অ্যাপ টালিখাতাতে। কাজের সুযোগ তৈরি করলেন লোকজনের জন্য। তিনি ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে শুধু নিজেই এগিয়ে যাচ্ছেন না। তিনি তার আশেপাশের অন্য ব্যবসায়ী এবং তরুণদেরকে নতুন  স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করেন। কিভাবে তিনি ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, কিভাবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম তাকে সহযোগিতা করেছে সেটার গল্প জানতে ক্লিক করুন এখানে। 

মূল গল্প

ডিজিটাল ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ ভাই একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সিরাজগঞ্জ সদর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে একডালা গ্রামে তাঁর মনোহরি দোকান মিথিলা স্টোর। তার বড় মেয়ের নামে এই ব্যবসা। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরে অল্প কিছুদিন চাকরি করেছেন। এরপরে ভাবলেন নিজেই ব্যবসা করবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। ২০১০ সালে ছোট একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু। আর বয়স তখন ২৩ বছর। এরপর মনোহারী বা জেনারেল স্টোরের ব্যবসা শুরু করেছেন। এখন তাঁর মোটামুটি বড় দোকান।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যদের মতো প্রযুক্তি তাঁকে প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। আগে মজিদ ভাই অন্যসব ব্যবসায়ীদের মতোই সনাতন পদ্ধতিতে ব্যবসা চালাতেন। হিসাব রাখতেন লম্বা খাতায়। কয়েকটা খাতা ছিল তার। বাকী হিসাব, ক্যাশ হিসাব এবং যোগ-বিয়োগ-দেনা পাওনা মিলিয়ে গলদঘর্ম হতে হত।

 

জেনারেল স্টোরে অনেক বাকি কাস্টমার থাকে। কাগজের লম্বা টালিখাতায় বাকির হিসাব রাখতেন। একটা খাতায় ১০০ পৃষ্ঠা থাকলে কোন পৃষ্ঠায় কোন কাস্টমার মনে রাখাও কঠিন হতো। প্রতিটি কাস্টমারের বাকি লিখে রাখা সম্ভব হতো না। অনেক সময় লিখতে ভুলে যেতেন। অনেক সময় গ্রাহকরা হয়তো বাকি নিয়ে ভুলে যেতেন অথবা বা ভুলে যেতে চাইতেন। কাস্টমারদের সাথে বাকির ব্যালেন্স নিয়ে মতপার্থক্য বা মনোমালিন্য হতো। এভাবে বাকি নিয়ে সমস্যার কারণে তার মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা শুধুমাত্র বাকির হিসাবের গন্ডগোলের কারণে ক্ষতি হয়ে যেত।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি তার স্মার্টফোনে ইন্টারনেট সার্চ করে টালিখাতা অ্যাপ ডাউনলোড করেন। এরপর থেকে ব্যবসাযর হিসাব রাখার জন্য টালিখাতা তার নিত্যসঙ্গী। ব্যবসার সকল হিসাব এখন তিনি টালিখাতায় রাখেন। বাকি দেবার সময়ে কাস্টমারের নাম খুঁজে এন্ট্রি করেন। সাথে সাথে কাস্টমার লেনদেনের ব্যালেন্সসহ এসএমএস পেয়ে যায়। বাকি নিয়ে আর কাস্টমারদের সাথে গরমিল হওয়ার কোন ভয় থাকে না। এসএমএসের মাধ্যমে তাগাদা পাঠিয়ে বাকি আদায়ও অনেক সহজ হয়েছে। মিথিলা স্টোরে হিসাবের ক্ষেত্রে কাগজ কলমের খাতার আর কোন স্থান নাই। পণ্য কেনা-বেচা খরচ সহ সমস্ত হিসাব টালিখাতায় রাখা হয়। সমস্ত হিসাব চোখের সামনে থাকায় ব্যবসা পরিচালনা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।

ছয় মাস নিয়মিত টালিখাতা ব্যবহারের পর একসময় টালিখাতা থেকে তাকে ফোন করা হয়, তিনি ব্যবসা বাড়ানোর জন্য দিনে ব্যাপারে আগ্রহী কিনা জানার জন্য। মজিদ ভাই জানেন যে ঋণ নেওয়া অনেক সমস্যা। অনেক কাগজপত্র লাগে। টালিখাতা থেকে জানানো হয় যে তার টালিখাতা হিসাব এবং পয়েন্ট প্রোফাইলের উপর ভিত্তি করেই মূলত ঋণ দেওয়া হবে। তবে অবশ্যই অত্যাবশ্যক কিছু কাগজপত্র তার কাছ থেকে নেয়া হবে যা স্ক্যান করে পাঠাতে পারেন। এভাবে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্র্যাক ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা এসএমই লোন পেয়েছেন।

তার দোকানের পাশে একটা রুম খালি ছিল। তিনি এই রুমটা ভাড়া নিলেন ১০,০০০ টাকা ডিপোজিট এবং মাসে ৫০০ টাকা ভাড়া হিসেবে। সেখানে তিনি মহিলাদের কসমেটিকস এবং গয়না ইত্যাদি নতুন ধরনের প্রোডাক্ট নিয়ে আসেন। নতুন ব্যবসা থেকে তিনি এখন মাসে ৫ থেকে 6 হাজার টাকা বাড়তি উপার্জন করছেন।

জেনারেল স্টোর বা কসমেটিক ব্যবসার পাশাপাশি, মজিদ ভাই বাড়িতে একটি গরুর খামার করেছেন। প্রথমে তার দুটা গরু ছিল। এখন সাতটা গরু। তিনি গরুর ঘাস, ভুসি বা খইল যোগান দেন। তবে গরুর পিছনে তার মা এবং স্ত্রী চেয়ে বেশি শ্রম দেন। তার দোকানের কাছে বাজারে গরুর দুধ বিক্রি করেন।

মজিদ ভাই ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বাড়িয়ে নিয়েছেন। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তিনি পরিকল্পনা করে কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রতিদিন ব্যবসার আয় থেকে ৫০০ টাকা আলাদা করে রাখেন যাতে করে ঋণের কিস্তি, মাসের দোকান ভাড়া এবং বিল পরিশোধে কোন অসুবিধা না হয়। আগে তার কখনো কোনো ব্যাংক একাউন্ট ছিল না। ব্যাংকে নিয়মিত লেনদেন করলে ভবিষ্যতে তারা আরো বড় প্রজেক্টে ব্যাংক ঋণের সমস্যা হবার কথা নয়। তিনি আশা করছেন তার ব্যবসা আরো বড় হবে। ভবিষ্যতে তিনি আরেকটি দোকান ভাড়া নিয়ে একটি পাইকারি ব্যবসা চালু করতে চাচ্ছেন।

মজিদ ভাই আধুনিক মনা একজন মানুষ। তিনি যখন বিয়ে করেছেন তখন স্ত্রী মেট্রিক পাশ। মজিদ ভাই স্ত্রীকে পড়াশোনার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি গর্বের সাথে জানান যে তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনে লেখাপড়ায় সমান – ডিগ্রী পাস। এভাবে একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করে তারা উপযুক্ত সহযোগী হয়ে উঠতে পেরেছেন।

মা, বাবা, স্ত্রী এবং দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। মেয়েদের নিয়ে তার পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারি। মেয়েদের সাথে কথা চিন্তা করে তিনি একই ডিপোজিট স্কিম চালু করতে চাচ্ছেন। ভবিষ্যতে মজিদ ভাই ব্যবসা আরো বড় করতে চান এবং আরেকটি পাইকারি ব্যবসা চালু করতে চান। তার ওখানে ইতোমধ্যেই তিনজন কর্মচারী কাজ করে।

তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রযুক্তি হাতে পেয়েছেন। প্রযুক্তি তাকে অনেক সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দিয়েছে। নিজের স্মার্টফোনের মাধ্যমে তিনি ব্যবসা কিভাবে বাড়ানো যায়, কোথায় কি পাওয়া যায়, কোথায় কি বাজার আছে – সে খবর রাখতে পারছেন। স্মার্টফোনে ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছেন। আরো একটি বড় ব্যবসা চালু করার ভাব কথা ভাবছেন।

সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত একডালা গ্রামের একজন মজিদ ভাই পড়াশুনা করে ব্যবসা শুরু করেছেন। লোকজনের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করেছেন। তিনি ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করে শুধু নিজেই এগিয়ে যাচ্ছেন না। তিনি তার আশেপাশের অন্য ব্যবসায়ী এবং তরুণদেরকে স্বপ্নের কথা বলেন। কিভাবে তিনি ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, কিভাবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম তাকে সহযোগিতা করেছে সেটার গল্প বলেন। এভাবে তিনি সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এভাবেই ডিজিটাল সিস্টেম এর সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চাকরির সুযোগ। বেড়ে যাচ্ছে দেশের উৎপাদন এবং সেবা। এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ।